করলা চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে সঠিক উপায়গুলো জেনে নিন আজই

করলা চাষ পদ্ধতি

করলা চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে প্রতিনিয়ত মানুষ গুগলে সার্চ করে থাকেন। করলা চাষ পদ্ধতি নিয়ে বহু মানুষের আগ্রহ রয়েছে। এর কারণ করলা বাংলাদেশের খুবই জনপ্রিয় সবজিগুলোর মধ্যে একটি। করলা স্বাদে অনেকটা তিক্ত হয়ে থাকে কিন্তু তবুও এর জনপ্রিয়তা কম নয়। বহু মানুষ নিজের পছন্দের সবজির তালিকায় করলা কে রাখেন।

করলায় রয়েছে বহু স্বাস্থ্য উপকারিতা। করলায় থাকা পুষ্টি উপাদান আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী। করলায় রয়েছে ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, ম্যাগনেসিয়াম, ফলিক এসিড, জিঙ্ক, ফসফরাস, ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়াম সহ আরো বহু পুষ্টি গুনাগুন। যেগুলো আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী।

করলার স্বাস্থ্য উপকারিতা:

  • করলা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
  • করলায় ক্যালোরি কম এবং ফাইবার বেশি থাকায় এটি ওজন কমাতে সহায়তা করে।
  • করলা হজমশক্তি উন্নত করতে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে।
  • করলাতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি থাকে যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
  • করলায় থাকা ভিটামিন ও মিনারেল ত্বক ভালো রাখে এবং ব্রণ সারাতে সাহায্য করে।
  • করলা চুলের গোড়া মজবুত করে এবং খুশকি দূর করতে সাহায্য করে।
  • করলা খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।
  • করলার অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং বায়োঅ্যাকটিভ যৌগ ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি রোধে সাহায্য করে।

এতসব স্বাস্থ্য উপকারিতা এবং জনপ্রিয়তা থাকার ফলে অনেকেই করলা চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে চান।

করলা চাষ পদ্ধতি

বাংলাদেশের মাটি এবং আবহাওয়া করলা চাষের জন্য খুবই উপযোগী। প্রায় সব রকমের মাটিতেই করলা চাষ করা যায় তবে দোআঁশ এবং বেলে দোআঁশ মাটিতে করলা বেশ ভালো চাষ হয়ে থাকে।

করলার জাত

বাংলাদেশের জনপ্রিয় কিছু উচ্চফলনশীল করলার জাত রয়েছে। যা আমাদের দেশে ব্যাপকভাবে চাষ হয়ে থাকে। সেখান থেকে আপনার পছন্দ অনুযায়ী জাত নির্বাচন করতে হবে। তবে সব থেকে জনপ্রিয় এবং সব থেকে বেশি চাষ হয়ে থাকে এমন দুটি জাত হলো বারি করলা-১ ও গজ করলা।

বারি করলা-১: এ জাতটি চারা গজানোর ৫০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে ফল দিয়ে থাকেন। প্রত্যেকটি ফলের ওজন হয়ে থাকে আনুমানিক ১০০ গ্রাম লম্বায় ১৭ থেকে ২০ সেন্টিমিটার। গাছ প্রতি ফল পাওয়া যায় ২৫ থেকে ৩০ টি। ভালোভাবে চাষ করতে পারলে এ জাতটি প্রতি হেক্টরে আনুমানিক ২০ থেকে ৩০ টন ফলন পাওয়া যায়।

গজ করলা : এ জাতের করলা অন্যান্য জাতের তুলনায় বেশ বড় হয়ে থাকে। গায়ের রং হয়ে থাকে গাঢ় সবুজ। এক একটি করলার ওজন হয়ে থাকে ১৫০ গ্রাম থেকে ২০০ গ্রাম। এবং প্রত্যেকটি গাছ থেকে ফলন পাওয়া যায় আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ টি করলা। লম্বায় প্রায় ২৫-৩০ সেন্টিমিটার হয়ে থাকে। ভালোভাবে চাষ করতে পারলে প্রতি শতাংশে আনুমানিক ১০০ থেকে ১২০ কেজি ফলন পাওয়া যায়।

চাষের মৌসুম

বাংলাদেশের করলার বীজ বপনের সব থেকে ভালো সময় হচ্ছে ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাস। ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে যেকোনো সময় করলার বীজ বপন করতে পারেন। তবে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় অনেকে জানুয়ারি মাসে বীজ বপন করে ফেলেন। কিন্তু জানুয়ারি মাসে পর্যাপ্ত বৃষ্টি হয় না। যার ফলে গাছ পর্যাপ্ত পুষ্টি পায় না এবং ফলন ভালো হয় না। তাই চেষ্টা করুন ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে যেকোনো সময় বীজ বপনের।

জমি তৈরি এবং বীজ বপন

করলা বাংলাদেশের সবরকম মাটিতেই চাষ করা যায় তাই জমি নির্বাচনের ক্ষেত্রে যে কোন জমিতে চাষ করতে পারবেন তবে চেষ্টা করুন দোআঁশ মাটি বা বেলে দোআঁশ মাটি যুক্ত জমি নির্বাচন করতে। কারণ এই দুই মাটিতে তুলনামূলক ভালো চাষ হয়ে থাকে। এবং অবশ্যই জমিতে পর্যাপ্ত সূর্যালোক থাকে এবং সেচ ও পানি নিষ্কাশন এর ব্যবস্থা রয়েছে এমন জমি নির্বাচন করুন।

করলা চাষের জন্য মাদা তৈরি করে বীজ বপন করতে পারেন অথবা নার্সারীর পলি ব্যাগেও বীজ বপন করতে পারেন। পলিব্যাগে বীজ বপন করার ক্ষেত্রে ৮ থেকে ১০ সেন্টিমিটারের পলিব্যাগ নিন। এবং প্রত্যেকটি পলিব্যাগে একটি করে বীজ বপন করুন। তবে অবশ্যই বীজ বপন করার আগে বীজ গুলোকে কম করে হলেও ১৫ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখুন। তারপর কিছুদিনের মধ্যেই বীজ থেকে চারা গজাবে। চারার বয়স যখন ১৫ থেকে ১৭ দিন হবে তখন তা মূল জমিতে রোপন করুন।

সারের পরিমাণ এবং প্রয়োগ

সঠিক নিয়মের সঠিক পরিমাণে সার প্রয়োগ করতে পারলে যে কোন ফসলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। আর করলা চাষে সারের সঠিক পরিমাণ নির্ভর করবে আপনার জমির মাটির উপর। আপনার জমির মাটির পুষ্টিগুণ সম্পর্কে জানা থাকলে সারের সঠিক পরিমাণ জানতে পারবেন। এজন্য সম্ভব হলে সার প্রয়োগের আগে আপনার জমির মাটি পরীক্ষা করে নিন। একটি সাধারণ নির্দেশিকা হলো:

  • পচা গোবর: পচা গোবর প্রতি শতাংশে ২০ কেজি প্রয়োগ করুন চারা রোপনের আগে। এবং চারা রোপনের ৭ থেকে ১০ দিন পূর্বে ৫ কেজি প্রয়োগ করুন প্রতি শতাংশে।
  • ইউরিয়া: ইউরিয়া সার শতাংশ প্রতি ৩৫০ গ্রাম প্রয়োগ করুন জমি তৈরির সময়। এবং শতাংশ প্রতি ৩০ গ্রাম প্রয়োগ করুন চারা রোপনের সাত থেকে ১০ দিন পূর্বে।
  • টিএসপি: টিএসপি সারকে ১৫ গ্রাম করে ৪ কিস্তিতে প্রয়োগ করতে হবে। চারা রোপনের দশ থেকে ৭৫ দিনের মধ্যে মোট চার বারে ৬০ গ্রাম প্রয়োগ করতে হবে (প্রতি শতাংশে)। 
  • এমওপি: এমওপি সার জমি তৈরির সময় ২০০ গ্রাম প্রয়োগ করুন। চারা রোপনের ৭ থেকে ১০ দিন আগে ২০ গ্রাম এবং চারা রোপনের ১৫ দিন পরে ১৫ গ্রাম প্রয়োগ করুন।

এটি সার প্রয়োগের একটি সাধারণ নির্দেশিকা তবে আপনার জমির মাটি বিবেচনায় এটি পরিবর্তন হতে পারে। তাই একদম সঠিক এবং নির্ভুল তথ্য জানতে আপনার স্থানীয় কোন কৃষিবিদের পরামর্শ নিন।

ফসল সংগ্রহ

চারা রোপনের ৪৫ দিন পর থেকে ও  স্ত্রীফুলের পরাগায়নের ১৫-২০ দিনের মধ্যে ফল খাওয়ার উপযুক্ত হয়ে যায়। করলার ফল যখন থেকে দেওয়া শুরু করবে তার ঠিক ৬০ দিন পর্যন্ত টানা দিতে থাকবে।

ফসলের পরিচর্যা

  • নিয়মিত সেচ দিতে হবে। প্রতিদিন সকালে অথবা বিকেলে জমিতে পানি দিতে হবে।
  • মাটির আর্দ্রতা বজায় রাখতে হবে।
  • আগাছা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। নিয়মিত আগাছা পরিষ্কার করতে হবে।
  • গাছের গোড়ায় মাটি চাপিয়ে দিতে হবে।
  • প্রয়োজনে সার প্রয়োগ করতে হবে।

প্রিয় পাঠক আশা করি আমাদের আজকের এই আর্টিকেলের মাধ্যমে করলা চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে আপনি একটি পরিপূর্ণ ধারণা পেয়েছেন। করলা চাষ পদ্ধতির সহ আরো এমন পোস্ট পেতে আমাদের ওয়েবসাইটটি ভিজিট করুন।

আরও পড়ুন – আনারস চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে সঠিক উপায়ে জেনে নিন আজকেই

Similar Posts