পেঁপে চাষের আধুনিক পদ্ধতি সম্পর্কে সঠিক উপায়গুলো জানুন

পেঁপে চাষের আধুনিক পদ্ধতি

পেঁপে চাষের আধুনিক পদ্ধতি সম্পর্কে অনেকেই জানতে চান। পেঁপে বাংলাদেশের জনপ্রিয় ফলগুলোর মধ্যে একটি। এটিকে ছোট বড় প্রায় সকলেই পছন্দ করে থাকেন। তবে পেঁপে চাষে অনেকেই ব্যর্থ হয় অনেকেই ভালো ফলন পায় না। সেটার কারণ হচ্ছে তারা পেঁপে চাষের আধুনিক পদ্ধতি অনুসরণ করে না। পেঁপে চাষে ভালো ফলন পেতে হলে অবশ্যই আধুনিক পদ্ধতিতে চাষ করতে হবে। পেঁপের চাহিদা বরাবরই বেশি আমাদের দেশে। কাঁচা পেঁপে কে সবজির সাথে রান্না করা যায়। আর পাকা পেঁপে তো সকলেই পছন্দ করেন খেতে। পেঁপে কিন্তু শুধু খেতেই সুস্বাদু নয়। পেঁপেতে রয়েছে বহু পুষ্টিগুণ যেমন ভিটামিন এ, ভিটামিন বি, ভিটামিন সি, পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ক্যালসিয়াম, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এগুলো সহ আরো অনেক পুষ্টিগুণ রয়েছে পেঁপেতে যা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী। পেঁপে কে বলা হয়ে থাকে পুষ্টির ভান্ডার। পেঁপের কিছু স্বাস্থ্য উপকারিতা হলো:

  • পেঁপেতে থাকা লাইকোপিন এবং বেটা-ক্যারোটিন নামক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি রোধ করতে সহায়তা করে।
  • পেঁপেতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি থাকে যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং ঠান্ডা, সর্দি, কাশি সহ এই ধরনের রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে।
  • পেঁপেতে থাকা প্যাপেইন নামক এনজাইম প্রোটিন হজমে সহায়তা করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য, অম্বল, পেট ফোলাভাব ও গ্যাসের সমস্যা দূর করে থাকে।
  • পেঁপেতে থাকা ফাইবার রক্তে খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।
  • পেঁপেতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ থাকে যা চোখের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো এবং রাতের অন্ধত্ব প্রতিরোধে সাহায্য করে।
  • পেঁপেতে ক্যালোরি কম এবং ফাইবার বেশি থাকে যা দীর্ঘক্ষণ পেটে ক্ষুধা লাগে না যার ফলে মানুষের ওজন কমাতে সাহায্য করে।
  • পেঁপেতে থাকা ভিটামিন এ এবং সি ত্বকের কোষের বৃদ্ধি ও পুনর্গঠনে সাহায্য করে এবং ব্রণ ও ফুসকুড়ি দূর করতে সাহায্য করে।

এতসব স্বাস্থ্য উপকারিতা পুষ্টিগুণ এবং খেতে সুস্বাদু হওয়ায় পেঁপে চাষে প্রতিনিয়ত অনেক মানুষ আগ্রহী হচ্ছেন।

পেঁপে চাষের আধুনিক পদ্ধতি

পেঁপে চাষে ভালো ফলন পেতে হলে অবশ্যই আপনাকে আধুনিক পদ্ধতি অবলম্বন করে পেঁপে চাষ করতে হবে। অন্যথায় ভালো ফলন পাবেন না। তাই চলুন জেনে নেওয়া যাক পেঁপে চাষের আধুনিক পদ্ধতি।

পেঁপের জাত

বাংলাদেশে অনেকগুলো পেঁপের জাত রয়েছে সেখান থেকে অবশ্যই আপনাকে আপনার পছন্দ অনুযায়ী উন্নতমানের জাত নির্বাচন করতে হবে। বাংলাদেশে পাওয়া যায় এমন কিছু পেঁপের জাত হলো: ওয়াশিংটন, কোয়েম্বাটুর-১ ও কোয়েম্বাটুর-২, কুর্গ হানিডিউ, সোলো সানরাইজ।

হাইব্রিড জাত : পুসাডোয়ার্ফ, পুসা নানহা, পুসা ম্যাজ্যেষ্টিক, পুসা রাসেল ইত্যাদি।

এখান থেকে আপনার পছন্দ অনুযায়ী যে কোন একটি জাত নির্বাচন করুন। আর পেঁপের বীজ কেনার সময় অবশ্যই ভালো এবং বিশ্বস্ত কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে বীজ কিনতে হবে।

জমি তৈরি এবং জমি নির্বাচন

পেঁপে চাষের ক্ষেত্রে জমি নির্বাচনের দিকে খুবই সতর্ক হতে হবে। কারণ পেঁপে গাছ কখনোই পানিতে বেড়ে উঠতে পারেনা। তাই জমি নির্বাচনের ক্ষেত্রে অবশ্যই উঁচু জমি নির্বাচন করতে হবে। যাতে বৃষ্টি হলেও সেখানে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকে। একই সাথে যদি গরমে মাটি শুকিয়ে যায় যাতে সেচ দেওয়া যায় সেই ব্যবস্থাও যেন থাকে। আর পেঁপে বাংলাদেশের প্রায় সব রকম মাটিতে চাষ করা যায়। তবে সব থেকে ভালো হয় যদি দোআঁশ বা বেলে দোআঁশ মাটির নির্বাচন করুন।

পেঁপে চাষের জন্য জমির মাটি উর্বর করে নিতে হবে মই এর মাধ্যমে। একইসাথে পাশাপাশি দুটি বেডের মাঝে ৩০সে.মি চওড়া এবং ২০ সে.মি. গভীর নালা তৈরি করে নিতে হবে। প্রতিটি বেড হতে হবে ২ মিটার চওড়া এবং জমি অনুযায়ী লম্বা করে নিতে হবে।

সার প্রয়োগ এবং গর্ত তৈরি

চারা রোপনের আগে বেডের মাঝ বরাবর আনুমানিক দুই মিটার দূরত্বে চারদিকে দুই ফুট গর্ত করে নিতে হবে। এটি করতে হবে চারা রোপনের ১৫ দিন আগে। গর্ত করা শেষ হলে সেখানে পরিমাণ মতো সার প্রয়োগ করতে হবে। তবে সার প্রয়োগের সঠিক পরিমাণ জানতে আপনার জমির মাটি পরীক্ষা করে নিতে পারেন। এতে করে সার প্রয়োগের সঠিক পরিমাণ জানতে পারবেন আপনার জমির মাটির পুষ্টি অনুযায়ী। আপনাদের সুবিধার্থে সার প্রয়োগের একটি সাধারণ নির্দেশিকা দেওয়া হলো:

১৫ কেজি পচা গোবর, ৫০০ গ্রাম ইউরিয়া সার, ৫০০ গ্রাম টিএসপি, ৫০০ গ্রাম এমওপি সার, ২৫০ গ্রাম জিপসাম, ২০ গ্রাম বরিক এসিড এবং ২০ গ্রাম জিংক সালফেট প্রতিটি গর্তে প্রয়োগ করতে হবে।

উপরে উল্লেখিত সারগুলো প্রয়োগ করতে হবে গর্ত তৈরীর সময়। তবে এখানে নেই ইউরিয়া এবং এমওপি সার। যা আপনাদের প্রয়োগ করতে হবে চারা লাগানোর পর যখনই গাছে নতুন পাতা গজাবে তখন  ৫০ গ্রাম করে প্রয়োগ করতে হবে এক মাস পর পর। তবে গাছে ফুল আসলে তখন ১০০ গ্রাম করে প্রয়োগ করতে হবে।

চারা তৈরি এবং চারা রোপন

পেঁপে চাষের জন্য প্রতি হেক্টরে অনুমানিক ১৫০ গ্রাম থেকে ৩০০ গ্রাম বীজের প্রয়োজন হয়। তবে হাইব্রিড বীজ হলে ১০০ থেকে ১৫০ গ্রামই যথেষ্ট। চারা বীজতলা তৈরি করেও করা যায় আবার পলিথিন ব্যবহার করেও করা যায়। আর বীজ বপনের সব থেকে ভাল সময় হচ্ছে আশ্বিন থেকে পৌষ মাসের মধ্যে যেকোনো সময়। এটাই পেপে চাষের জন্য সবথেকে ভালো সময়।

পলিব্যাগেও  বীজ বপন করতে পারেন অথবা বেড তৈরি করেও করতে পারেন। বেড তৈরি করে বীজ বপন করলে। ১০ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার দূরত্বে সারি তৈরি করুন। এবং বীজ বপন করুন তিন থেকে পাঁচ সেন্টিমিটার গভীরে।

বীজ থেকে চারা গজাতে সময় লাগে অনুমানিক ১৬ থেকে ২০ দিন। এর মধ্যে চারা গজিয়ে যায়। চারা গজিয়ে গেলে তা মূল জমিতে রোপন করতে হবে ৪০ থেকে ৫০ দিন পর।

যদি চারা পলিব্যাগে রোপন করেন তাহলে কিছু বিষয়ে লক্ষ্য রাখতে হবে। চারা রোপনের সময় যেন গাছের গোড়ার মাটি ভেঙ্গে না যায় এবং পলিব্যাগে চারা যতটা গভীরে ছিল রোপন করার সময়ও যেন ততটা গভীরে থাকে এর থেকে বেশি কিংবা কম গভীরতা যেন না হয়।

গাছের পরিচর্যা

পেঁপে চাষের ক্ষেত্রে সব রকম নিয়ম অলম্বন করলেও গাছের পরিচর্যা করার গুরুত্ব অপরিহার্য। কারণ ঠিক মত গাছের পরিচর্যা না করলে পেঁপে চাষের আধুনিক পদ্ধতি অবলম্বন করলেও ভালো ফলন পাবেন না।

  • পেঁপে গাছের গোড়ার মাটি যদি বেশি শুকিয়ে যায় তাহলে নিয়মিত সেচ দিন। বিশেষ করে গাছ যখন বড় হওয়া শুরু করবে ঠিক সেই মুহূর্তে।
  • গাছে যদি অতিরিক্ত পাতা জন্মায় সেক্ষেত্রে কিছু পাতা ভেঙ্গে দেন। তাহলে গাছে পর্যাপ্ত সূর্যের আলো পৌঁছাবে।
  • সার প্রয়োগের আগে সারের সঠিক পরিমাণ জানতে মাটি পরীক্ষা করে নিন।
  • নিয়মিত আগাছা দমন করুন এবং গাছের গোড়া আলসা করে দেন। 
  • গাছে যদি বেশি ফল ধরে গাছ নুয়ে যায় সেক্ষেত্রে বাঁশ বা কোন কিছু দিয়ে গাছের পেছনে লাগিয়ে দিন তাহলে গাছ আর নুয়ে পরবে না।
  • পোকামাকড় ও রোগবালাইয়ের আক্রমণ থেকে গাছকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনে কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক ব্যবহার করুন।

পেঁপে গাছের পরিচিত তিনটা রোগ হলো: মোজাইক রোগ, ঢলে পড়া ও কাণ্ড পঁচা রোগ, পেঁপের ড্যাম্পিং অফ রোগ। এই রোগগুলো হলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে দ্রুত দমন করুন।

প্রিয় পাঠক আশা করি আমাদের আজকের এই আর্টিকেল এর মাধ্যমে পেঁপে চাষের আধুনিক পদ্ধতি সম্পর্কে আপনি একটি পরিপূর্ণ ধারণা পেয়েছেন। আরো এমন সব আর্টিকেল পড়তে আমাদের ওয়েবসাইটটি ভিজিট করুন।

আরও পড়ুন – মাশরুম চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে সঠিক উপায়গুলো জানুন আজকেই

Similar Posts