হাইব্রিড ঢেঁড়স চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে সঠিক উপায়ে জানুন আজই

হাইব্রিড ঢেঁড়স চাষ পদ্ধতি

হাইব্রিড ঢেঁড়স চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে প্রতিনিয়ত মানুষ গুগলে খুঁজে থাকেন। ঢেঁড়স আমাদের দেশের খুবই পরিচিত একটি সবজি। অনেকে নিজের পছন্দের সবজির তালিকায় শীর্ষে রাখেন ঢেঁড়স কে। ছোট বড় সকলেই  খুবই পছন্দ করেন ঢেঁড়স কে।

বিশেষজ্ঞদের মতে ঢেঁড়সের উৎপত্তি হয়েছে উত্তর-পূর্ব আফ্রিকাতে । তবে বর্তমানে যা বহু দেশেই চাষ হয়ে থাকে। তেমনি আমাদের দেশও তার ব্যতিক্রম নয়। প্রতিবছর বাংলাদেশেও ঢেঁড়স চাষ হয়ে থাকে। এবং প্রতিনিয়ত মানুষ আগ্রহ নিয়ে হাইব্রিড ঢেঁড়স চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে গুগলে সার্চ করে থাকেন। ঢেঁড়স যে শুধু খেতেই সুস্বাদু তা কিন্তু নয়। বহু পুষ্টিগুণে ভরপুর একটি সবজি হলো ঢেঁড়স। ঢেঁড়সে রয়েছে ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, ভিটামিন কে, ভিটামিন বি6 এবং খনিজ পদার্থ সহ আরো অনেক পুষ্টিগুণ যা মানব দেহের জন্য খুবই উপকারী।

ঢেঁড়সের কিছু স্বাস্থ্য উপকারিতা হলো :-

  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
  • হজম উন্নত করে।
  • হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।
  • ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়।
  • রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
  • রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
  • ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
  • চোখের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।
  • ত্বকের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।
  • হাড় ও দাঁতের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।

এতসব স্বাস্থ্য উপকারিতা এবং একই সাথে সুস্বাদু হওয়ায় ঢেঁড়সের চাহিদা সব সময় বেশি থাকে। তাই অনেকেই ঢেঁড়স চাষে আগ্রহী। 

হাইব্রিড ঢেঁড়স চাষ পদ্ধতি

আমাদের দেশীয় ঢেঁড়সের তুলনায় হাইব্রিড ঢেঁড়স চাষে রয়েছে তুলনামূলক বেশি সুবিধা। যার ফলে অনেকেই দেশী ঢেঁড়সের তুলনায় হাইব্রিড ঢেঁড়স চাষ করতে বেশি আগ্রহী। আমাদের দেশীয় ঢেঁড়সের তুলনায় হাইব্রিড ঢেঁড়সের ফলন হয় তুলনামূলক অনেক বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে দেশীয় ঢেঁড়সের তুলনায় হাইব্রিড ঢেঁড়স চাষে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি ফলন পাওয়া যায়। এবং একই সাথে হাইব্রিড ঢেঁড়সের রয়েছে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক বেশি। তাই ফসলে রোগবালাই কম হয় এবং ফলনও বেশি হয়।

হাইব্রিড ঢেঁড়সের জাত

হাইব্রিড ঢেঁড়সের বাংলাদেশে বেশ কিছু জনপ্রিয় জাত রয়েছে। তবে আপনাকে অবশ্যই আপনার জমির মাটি পরীক্ষা করে এবং আবহাওয়া বিবেচনা করে সঠিক জাত নির্বাচন করতে হবে। এজন্য স্থানীয় কৃষিবিদের পরামর্শ নিতে পারেন। বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য কিছু জনপ্রিয় জাত হলো:

১. সুবর্ণ সুপার ১: এটির বৈশিষ্ট্য

  • সারা বছর চাষ করা যায়।
  • হলুদ মোজাইক ভাইরাস ও পাতা মোড়ানো ভাইরাস প্রতিরোধী।
  • ৮০-৯০ দিনের মধ্যে ফলন পাওয়া যায়।
  • প্রতি গাছে ৫০-৬০ টি ঢেঁড়স পাওয়া যায়।
  • ঢেঁড়স লম্বা (১০-১২ ইঞ্চি) ও মোটা (১.৫-২ সেমি) হয়।

২. রাজা: এটির বৈশিষ্ট্য

  • গ্রীষ্মকালে চাষ করা ভালো।
  • ইস্পাহানি জাতের উন্নত জাত।
  • ৬০-৭০ দিনের মধ্যে ফলন পাওয়া যায়।
  • প্রতি গাছে ৪০-৫০ টি ঢেঁড়স পাওয়া যায়।
  • ঢেঁড়স লম্বা (৮-১০ ইঞ্চি) ও মোটা (১-১.৫ সেমি) হয়।

৩. ললনা: এটির বৈশিষ্ট্য

  • বর্ষাকালে চাষ করা ভালো।
  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি।
  • ৭০-৮০ দিনের মধ্যে ফলন পাওয়া যায়।
  • প্রতি গাছে ৩০-৪০ টি ঢেঁড়স পাওয়া যায়।
  • ঢেঁড়স লম্বা (৭-৮ ইঞ্চি) ও মোটা (১ সেমি) হয়।

৪. মধুমতি সুপার: এটির বৈশিষ্ট্য

  • সারা বছর চাষ করা যায়।
  • হলুদ মোজাইক ভাইরাস প্রতিরোধী।
  • ৬৫-৭৫ দিনের মধ্যে ফলন পাওয়া যায়।
  • প্রতি গাছে ৪৫-৫০ টি ঢেঁড়স পাওয়া যায়।
  • ঢেঁড়স লম্বা (৮-১০ ইঞ্চি) ও মোটা (১.৫ সেমি) হয়।

৫. গুনগুন: এটির বৈশিষ্ট্য

  • গ্রীষ্মকালে চাষ করা ভালো।
  • কম পাতা ও আন্তঃগাঁট ফাঁক থাকে।
  • ৫০-৬০ দিনের মধ্যে ফলন পাওয়া যায়।
  • প্রতি গাছে ৩০-৩৫ টি ঢেঁড়স পাওয়া যায়।
  • ঢেঁড়স লম্বা (৬-৭ ইঞ্চি) ও মোটা (১ সেমি) হয়।

এই জাতগুলো ছাড়াও বাংলাদেশে আরো বেশ কিছু হাইব্রিড ঢেঁড়সের জাত রয়েছে। তবে ভালো ফলন পেতে হলে অবশ্যই আপনাকে সঠিক জাত নির্বাচন করতে হবে। সঠিক জাত নির্বাচনের ক্ষেত্রে মাটি পরীক্ষা করা খুবই জরুরী। তবে মাটি অনুযায়ী সঠিক জাত নির্বাচন করতে পারবেন। 

হাইব্রিড ঢেঁড়সের বীজ বপন

সঠিক জাত নির্বাচন করে বাজার থেকে উন্নতমানের  বীজ সংগ্রহ করুন। ঢেঁড়সের বীজ বাজারে খুব সহজেই পাওয়া যায়।

বীজ বপণের আগে বীজকে ১২ থেকে ২৪ ঘন্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখুন।এতে বীজ দ্রুত অঙ্কুরিত হবে। বীজ বপনের আগে মাটি ভালোভাবে সেচ দিয়ে তৈরি করে নিতে হবে। মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করতে মাটিতে জৈব সার প্রয়োগ করতে পারেন এতে করে ভালো ফলন পাওয়া যাবে।

এবার ঢেঁড়সের বীজ বপন করার জন্য সারি অনুসারে ৩০ সেন্টিমিটার দূরত্ব বজায় রেখে গর্ত করুন। এবং প্রতি গর্তের গভীরতা থাকতে হবে আনুমানিক ৫ সেন্টিমিটার। এবার প্রতি গর্তে ২ থেকে ৩ টি বীজ বপন করুন। এভাবে বীজ বপন শেষে মাটি দিয়ে ঢেকে দিন এবং হালকা সেচ দিন।

সার প্রয়োগ:

ঢেঁড়স চাষে ভালো ফলন পাওয়ার জন্য অবশ্যই সঠিক নিয়মে সঠিক পরিমাণে সার প্রয়োগ করতে হবে। আর সঠিক পরিমাণে সার প্রয়োগ করার জন্য অবশ্যই আপনার মাটি পরীক্ষা করে। মাটিতে থাকা পুষ্টি এবং পুষ্টির অভাব বিবেচনা করে সারের সঠিক পরিমাণ জানতে হবে। একটি সাধারণ নির্দেশিকা হল।

  • ইউরিয়া সার: প্রতি হেক্টরে ১০০-১২০ কেজি
  • টিএসপি সার: প্রতি হেক্টরে ১৫০-২০০ কেজি
  • এমওপি সার: প্রতি হেক্টরে ৮০-১০০ কেজি
  • জিপসাম সার: প্রতি হেক্টরে ২০-৩০ কেজি

ইউরিয়া সারকে তিন ভাগ করুন। এবার প্রথম ভাগ প্রয়োগ করতে হবে বীজ বপণের সময় এবং দ্বিতীয় ভাগ প্রয়োগ করতে হবে ফুল ফোটার সময় ও তৃতীয় ভাগ প্রয়োগ করতে হবে ফল ধরার সময়।

এমওপি সারকে প্রয়োগ করতে হবে বীজ বপনের সময় এবং ফল ধরার সময়। এবং টিপিএসপি এবং জিপসাম সার কে প্রয়োগ করতে হবে বীজ বপনের সময়।

বীজ বপনের সময় মাটির উর্বরতা বাড়াতে জৈব সার ব্যবহার করুন। আপনার মাটি এবং আবহাওয়া বিবেচনা করে সারের পরিমাণ কম বেশি হতে পারে তাই স্থানীয় কৃষিবিদের পরামর্শ নিয়ে সার প্রয়োগ করুন।

ফসলের পরিচর্যা:

  • ঢেঁড়স গাছের জন্য নিয়মিত ও পর্যাপ্ত সেচ প্রয়োজন। বিশেষ করে গাছের বৃদ্ধির প্রাথমিক পর্যায়ে এবং ফুল আসার সময় নিয়মিত সেচ প্রয়োজন।
  • গ্রীষ্মের দিনে দিনে দুই বার সেচ করা ভালো।
  • বৃষ্টির সময় সেচ বন্ধ রাখা উচিত।
  • সেচের সময় পানি গাছের গোড়ায় দিতে হবে এবং মাটি ভিজে গেলে সেচ বন্ধ করে দিতে হবে।
  • ঢেঁড়স গাছের আশেপাশে নিয়মিত আগাছা দমন করা প্রয়োজন। কারণ আগাছা ঢেঁড়স গাছের পুষ্টি ও আলো শোষণ করে এবং ফলনের পরিমাণ কমিয়ে দেয়।
  • আগাছা দমনের জন্য হাত দিয়ে আগাছা তোলা যায় অথবা কোদাল, হাড়ি, ইত্যাদি ব্যবহার করে আগাছা পরিষ্কার করা যায়।
  • আগাছা দমনের সময় সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত যাতে ঢেঁড়স গাছের ক্ষতি না হয়।

প্রিয় পাঠক আমাদের আজকের এই আর্টিকেলের মাধ্যমে আপনাদেরকে হাইব্রিড ঢেঁড়স চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে একটি পরিপূর্ণ ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। আশা করি আমাদের আজকের এই আর্টিকেলের মাধ্যমে হাইব্রিড ঢেঁড়স চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে আপনি একটি পরিপূর্ণ ধারণা পেয়েছেন। আরো এমন সব পোস্ট পেতে আমাদের ওয়েবসাইট ভিজিট করুন।

আরও জানুন – হাইব্রিড বেগুন চাষ পদ্ধতি জেনে নিন সঠিক উপায়ে জেনে নিন

Similar Posts